মলদ্বারে অর্শ (পাইলস) | ডা. ফারিদুল ইসলাম
মলদ্বারে অর্শ কী?
মলদ্বারে অর্শ, যা সাধারণভাবে পাইলস (Hemorrhoids) নামে পরিচিত, হলো মলদ্বার ও মলাশয়ের নিচের অংশের রক্তনালিগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ার একটি অবস্থা। এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি রোগ এবং নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগ, গর্ভাবস্থা, স্থূলতা এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার মতো কারণগুলো অর্শের ঝুঁকি বাড়ায়।অর্শ সাধারণত দুটি ধরনের হয়—
- অভ্যন্তরীণ অর্শ (Internal Hemorrhoids): মলদ্বারের ভেতরে থাকে এবং প্রথম দিকে ব্যথা নাও হতে পারে, তবে রক্তপাত হতে পারে।
- বাহ্যিক অর্শ (External Hemorrhoids): মলদ্বারের বাইরে হয় এবং ব্যথা, ফোলা, চুলকানি ও অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
সময়মতো চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগী অস্ত্রোপচার ছাড়াই সুস্থ হতে পারেন। তবে উন্নত পর্যায়ে আধুনিক লেজার বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
মলদ্বারে অর্শ কেন হয়?
অর্শ হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো—
১. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য
শক্ত মল এবং অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগ করলে মলদ্বারের রক্তনালির ওপর চাপ পড়ে, যা অর্শের অন্যতম প্রধান কারণ।
২. দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা
মোবাইল ফোন ব্যবহার বা দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকলে রক্তনালির ওপর চাপ বেড়ে যায়।
৩. গর্ভাবস্থা
গর্ভাবস্থায় জরায়ুর চাপ এবং হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারীর অর্শ হয়।
৪. স্থূলতা
অতিরিক্ত ওজন পেলভিক অঞ্চলে চাপ বাড়িয়ে অর্শের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
৫. কম আঁশযুক্ত খাদ্য
কম ফাইবারযুক্ত খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য সৃষ্টি করে এবং অর্শের ঝুঁকি বাড়ায়।
৬. ভারী ওজন তোলা
নিয়মিত ভারী জিনিস তুললে পেটের ভেতরের চাপ বৃদ্ধি পায়।
৭. বয়স
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মলদ্বারের টিস্যুর স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়, ফলে অর্শের ঝুঁকি বাড়ে।
মলদ্বারে অর্শের লক্ষণ
অর্শের লক্ষণ রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
- মলত্যাগের সময় টাটকা লাল রক্ত পড়া
- মলদ্বারে চুলকানি
- জ্বালাপোড়া
- মলদ্বারে ফোলা
- মাংস বের হওয়া
- মলদ্বারে ব্যথা (বিশেষ করে বাহ্যিক অর্শে)
- বসতে অস্বস্তি
- মলত্যাগের পরও অসম্পূর্ণতার অনুভূতি
অর্শের পর্যায় (Grades of Internal Hemorrhoids)
গ্রেড ১
- শুধু রক্তপাত হয়
- মাংস বাইরে আসে না
গ্রেড ২
- মলত্যাগের সময় বাইরে আসে
- পরে নিজে থেকেই ভেতরে চলে যায়
গ্রেড ৩
- বাইরে এলে হাতে ভেতরে ঢোকাতে হয়
গ্রেড ৪
- সবসময় বাইরে থাকে
- নিজে থেকে বা হাতে ভেতরে যায় না
- অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি থাকলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—
- বারবার রক্তপাত
- তীব্র ব্যথা
- মলদ্বারে বড় ফোলা
- মাংস বের হয়ে আটকে যাওয়া
- পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
- ওজন কমে যাওয়া বা মলের অভ্যাস পরিবর্তন
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী নিচের পরীক্ষা করতে পারেন—
- রোগের ইতিহাস নেওয়া
- শারীরিক পরীক্ষা
- Digital Rectal Examination (DRE)
- Anoscopy
- Proctoscopy
- Sigmoidoscopy
- Colonoscopy (বিশেষ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দীর্ঘদিন রক্তপাত হলে)
মলদ্বারে অর্শের আধুনিক চিকিৎসা
চিকিৎসা রোগের পর্যায় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।
১. জীবনযাত্রার পরিবর্তন
- আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- নিয়মিত ব্যায়াম
- কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ
২. ওষুধ
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী দিতে পারেন—
- মল নরম করার ওষুধ
- ব্যথানাশক
- প্রদাহ কমানোর ওষুধ
- বিশেষ ক্রিম বা সাপোজিটরি
৩. নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা
প্রাথমিক ও মাঝারি পর্যায়ের অর্শে নিম্নলিখিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে—
- Rubber Band Ligation
- Sclerotherapy
- Infrared Coagulation
৪. লেজার পাইলস চিকিৎসা
নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে Laser Piles Treatment একটি আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি। এর সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- কম ব্যথা
- কম রক্তপাত
- দ্রুত সুস্থ হওয়া
- হাসপাতালে কম সময় থাকতে হয়
৫. অস্ত্রোপচার
গ্রেড ৩ বা গ্রেড ৪ অর্শ কিংবা জটিল ক্ষেত্রে Hemorrhoidectomy বা অন্যান্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।
ঘরোয়া যত্ন
চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি—
- দিনে ২–৩ বার কুসুম গরম পানিতে সিটজ বাথ করুন।
- প্রতিদিন ২–৩ লিটার পানি পান করুন।
- আঁশযুক্ত খাবার খান।
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।
- দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকবেন না।
- নিয়মিত হাঁটুন।
যেসব খাবার উপকারী
- সবুজ শাকসবজি
- ফলমূল
- ওটস
- ডাল
- ইসবগুলের ভুসি
- ব্রাউন রাইস
- পর্যাপ্ত পানি
যেসব খাবার সীমিত রাখুন
- অতিরিক্ত ঝাল খাবার
- ফাস্টফুড
- ভাজাপোড়া
- অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার
- কোমল পানীয়
- অতিরিক্ত অ্যালকোহল
প্রতিরোধের উপায়
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- উচ্চ আঁশযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করুন।
- নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
- দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কমান।
- মলত্যাগের চাপ চেপে রাখবেন না।
- টয়লেটে মোবাইল ব্যবহার ও অযথা দীর্ঘ সময় বসে থাকা এড়িয়ে চলুন।
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
কেন ডা. ফারিদুল ইসলাম?
ডা. ফারিদুল ইসলাম পাইলস, এনাল ফিশার, এনাল ফিস্টুলা এবং অন্যান্য কোলোরেক্টাল রোগের আধুনিক চিকিৎসায় অভিজ্ঞ। রোগের সঠিক কারণ নির্ণয় করে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রদান করা হয়।
চিকিৎসার বিশেষ সুবিধা—
- সঠিক রোগ নির্ণয়
- আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা
- ওষুধ ও নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা
- প্রয়োজনে আধুনিক লেজার প্রযুক্তি
- রোগীভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা
- নিয়মিত ফলো-আপ
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
মলদ্বারে অর্শ কি নিজে নিজে ভালো হয়?
প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে উপসর্গ কমতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের বা গুরুতর অর্শের ক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রয়োজন।
অর্শ হলে কি সবসময় অপারেশন লাগে?
না। অধিকাংশ রোগী ওষুধ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসায় ভালো হন। শুধু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।
অর্শের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ কী?
মলত্যাগের সময় টাটকা লাল রক্ত পড়া, মলদ্বারে চুলকানি, ফোলা এবং মাংস বের হওয়া অর্শের সাধারণ লক্ষণ।
উপসংহার
মলদ্বারে অর্শ (পাইলস) একটি সাধারণ কিন্তু অবহেলা করলে জটিল হয়ে উঠতে পারে। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। বারবার রক্তপাত, তীব্র ব্যথা বা মলদ্বারে মাংস বের হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।আপনি যদি মলদ্বারে অর্শ, পাইলস, রক্তপাত, এনাল ফিশার, ফিস্টুলা বা অন্যান্য মলদ্বারের সমস্যায় ভুগে থাকেন, তাহলে ডা. ফারিদুল ইসলাম-এর পরামর্শ নিন। আধুনিক চিকিৎসা, সঠিক পরামর্শ এবং নিয়মিত ফলো-আপের মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।