মলদ্বারে গুটি

মলদ্বারে গুটি

মলদ্বারে গুটি হওয়া একটি পরিচিত সমস্যা। অনেকেই মলদ্বারের আশেপাশে ছোট বা বড় গুটি অনুভব করলে প্রথমেই এটিকে পাইলস মনে করেন। তবে মলদ্বারে গুটি হওয়ার পেছনে শুধু পাইলস নয়, ফিশার, ফিস্টুলা, অ্যানাল স্কিন ট্যাগ, সংক্রমণ বা অ্যাবসেসসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই গুটির কারণ না জেনে নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার করা বা গুটি চেপে ধরার চেষ্টা করা উচিত নয়।

গুটির সঙ্গে যদি ব্যথা, রক্তপাত, চুলকানি, জ্বালাপোড়া, পুঁজ বা মলত্যাগে সমস্যা থাকে, তাহলে একজন মলদ্বার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা কোলোরেক্টাল বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ বা চিকিৎসা করা সম্ভব।

মলদ্বারে গুটি কেন হয়?

মলদ্বারে গুটি হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। সাধারণ কারণগুলো হলো—

১. পাইলস বা হেমোরয়েড

পাইলস হলো মলদ্বার ও পায়ুপথের রক্তনালি এবং আশেপাশের টিস্যু ফুলে যাওয়ার একটি সমস্যা। এতে মলদ্বারের ভেতরে বা বাইরে গুটি অনুভূত হতে পারে।

পাইলসের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে—

  • মলত্যাগের সময় টাটকা লাল রক্ত
  • মলদ্বারে গুটি
  • মাংস বের হয়ে আসা
  • চুলকানি
  • জ্বালাপোড়া
  • অস্বস্তি
  • কখনও ব্যথা

কোষ্ঠকাঠিন্য ও মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া পাইলসের সমস্যা বাড়াতে পারে।

২. থ্রম্বোসড হেমোরয়েড

কখনও পাইলসের ফুলে যাওয়া রক্তনালির মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। একে থ্রম্বোসড হেমোরয়েড বলা হয়। এতে হঠাৎ করে মলদ্বারের পাশে শক্ত ও ব্যথাযুক্ত গুটি তৈরি হতে পারে।

গুটিটি নীলচে বা বেগুনি রঙের দেখাতে পারে এবং বসা বা হাঁটার সময় ব্যথা বাড়তে পারে।

৩. অ্যানাল ফিশার

মলদ্বারের ভেতরের চামড়ায় ছোট ফাটল বা ক্ষত হলে তাকে অ্যানাল ফিশার বলা হয়। দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল বা মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপের কারণে এটি হতে পারে।

ফিশারের পাশে ছোট চামড়ার গুটি বা skin tag তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে সাধারণত মলত্যাগের সময় তীব্র ব্যথা ও রক্তপাত থাকতে পারে।

৪. ফিস্টুলা

ফিস্টুলা হলো মলদ্বারের ভেতরের অংশ এবং বাইরের ত্বকের মধ্যে অস্বাভাবিক একটি পথ তৈরি হওয়া। অনেক ক্ষেত্রে আগে মলদ্বারের পাশে ফোঁড়া বা সংক্রমণ হওয়ার পর ফিস্টুলা তৈরি হতে পারে।

ফিস্টুলার ক্ষেত্রে—

  • মলদ্বারের পাশে গুটি
  • বারবার ফোলা
  • পুঁজ বা তরল বের হওয়া
  • ব্যথা
  • একই জায়গায় বারবার ফোঁড়া হওয়া

ইত্যাদি দেখা যেতে পারে।

৫. পায়ুপথের অ্যাবসেস বা ফোঁড়া

মলদ্বারের আশেপাশে সংক্রমণের কারণে পুঁজ জমে ফোঁড়া বা অ্যাবসেস হতে পারে। এতে দ্রুত ফোলা ও ব্যথাযুক্ত গুটি তৈরি হতে পারে।

জ্বর, কাঁপুনি, তীব্র ব্যথা বা দ্রুত ফুলে যাওয়া থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৬. অ্যানাল স্কিন ট্যাগ

মলদ্বারের চারপাশে অতিরিক্ত ত্বকের ছোট অংশ ঝুলে থাকলে তাকে অ্যানাল স্কিন ট্যাগ বলা হয়। এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। পুরোনো পাইলস বা ফিশারের পরও এমন অতিরিক্ত ত্বক থাকতে পারে।

মলদ্বারে গুটির সঙ্গে কী কী লক্ষণ দেখা যায়?

গুটির কারণ অনুযায়ী উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • মলদ্বারের পাশে গুটি অনুভব করা
  • মলত্যাগের সময় গুটি বড় বা স্পষ্ট হওয়া
  • মলদ্বারে ব্যথা
  • পায়খানার সময় রক্ত পড়া
  • চুলকানি
  • জ্বালাপোড়া
  • পায়ুপথে ফোলা
  • পুঁজ বা তরল বের হওয়া
  • মলত্যাগের সময় অস্বস্তি
  • দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য
  • মলত্যাগের পরও পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি

সব গুটি একই রোগের লক্ষণ নয়। তাই উপসর্গের ধরন ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।

মলদ্বারে গুটি হলে কী করবেন?

মলদ্বারে গুটি অনুভব করলে প্রথমে আতঙ্কিত না হয়ে কিছু সাধারণ যত্ন নিতে পারেন।

কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ করুন

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও আঁশযুক্ত খাবার রাখুন। শক্ত মল হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফাইবার বা স্টুল-সফটেনার ব্যবহার করা যেতে পারে।

মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না

জোর করে মলত্যাগ করার চেষ্টা করলে পাইলস, ফিশার বা মলদ্বারের অন্যান্য সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না

অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে মোবাইল ব্যবহার করতে করতে দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা ভালো অভ্যাস নয়।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন

মলত্যাগের পর মলদ্বার পরিষ্কার রাখুন। অতিরিক্ত ঘষাঘষি বা সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালা হতে পারে।

গুটি চেপে ধরবেন না

মলদ্বারের গুটি চেপে পুঁজ বা রক্ত বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়। নিজে থেকে গুটি কেটে বা ফুটো করাও বিপজ্জনক হতে পারে এবং সংক্রমণ বাড়াতে পারে।

মলদ্বারে গুটির চিকিৎসা কী?

চিকিৎসা সম্পূর্ণভাবে গুটির কারণের ওপর নির্ভর করে। তাই আগে সঠিক রোগ নির্ণয় করা জরুরি।

পাইলসের চিকিৎসা

প্রাথমিক পর্যায়ে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পানি, আঁশযুক্ত খাবার এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে চিকিৎসক ওষুধ বা অন্যান্য চিকিৎসা দিতে পারেন।

কিছু ক্ষেত্রে অপারেশন ছাড়া পাইলসের চিকিৎসা যেমন রাবার ব্যান্ড লিগেশন, ইনফ্রারেড কোয়াগুলেশন বা অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে। রোগের ধরন ও গ্রেড অনুযায়ী চিকিৎসা নির্বাচন করা হয়।

থ্রম্বোসড হেমোরয়েডের চিকিৎসা

ব্যথার মাত্রা, গুটির অবস্থান এবং কত সময় ধরে সমস্যা রয়েছে তার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ ও স্থানীয় যত্ন যথেষ্ট হতে পারে, আবার নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ছোট প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ফিশারের চিকিৎসা

ফিশারের ক্ষেত্রে মল নরম রাখা, কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী ফিশারে বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

ফিস্টুলার চিকিৎসা

ফিস্টুলা সাধারণত শুধু ওষুধ দিয়ে স্থায়ীভাবে ঠিক হয় না। ফিস্টুলার পথ, অবস্থান এবং মলদ্বারের পেশির সঙ্গে সম্পর্ক বুঝে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। প্রয়োজনে ফিস্টুলোটমি, সেটন, লেজার বা অন্যান্য আধুনিক পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে।

অ্যাবসেস বা ফোঁড়ার চিকিৎসা

মলদ্বারের অ্যাবসেস হলে শুধু ব্যথার ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। পুঁজ জমে থাকলে চিকিৎসকের মাধ্যমে যথাযথভাবে ড্রেনেজ বা অন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?

মলদ্বারে গুটির সঙ্গে নিচের যেকোনো সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—

  • হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হওয়া
  • গুটি দ্রুত বড় হয়ে যাওয়া
  • জ্বর বা কাঁপুনি
  • গুটি থেকে পুঁজ বের হওয়া
  • প্রচুর রক্তপাত
  • গুটি নীল বা কালচে হয়ে যাওয়া
  • গুটি বাইরে বের হয়ে এসে ভেতরে না ঢোকা
  • বারবার একই জায়গায় ফোলা বা ফোঁড়া হওয়া
  • মলত্যাগে গুরুতর সমস্যা হওয়া

বিশেষ করে পায়ুপথে গুটি ও জ্বর বা তীব্র ব্যথা থাকলে সংক্রমণ বা অ্যাবসেসের মতো সমস্যার সম্ভাবনা বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

মলদ্বারে গুটি নির্ণয় কীভাবে করা হয়?

চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, কতদিন ধরে সমস্যা হচ্ছে, রক্তপাত বা পুঁজ হচ্ছে কি না এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ইতিহাস জানতে পারেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী মলদ্বার ও আশেপাশের অংশ পরীক্ষা করা হয়।

পরিস্থিতি অনুযায়ী ডিজিটাল রেক্টাল পরীক্ষা, অ্যানোস্কোপি, প্রোক্টোস্কোপি বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে। ফিস্টুলা বা গভীর সংক্রমণের ক্ষেত্রে কিছু রোগীর ইমেজিং পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

মলদ্বারে গুটি প্রতিরোধের উপায়

সব ধরনের গুটি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে—

  • পর্যাপ্ত পানি পান করা
  • প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
  • কোষ্ঠকাঠিন্য এড়ানো
  • মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া
  • টয়লেটে বেশি সময় না বসা
  • নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করা
  • মলদ্বার পরিষ্কার রাখা
  • দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থাকা
  • মলদ্বারে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া

মলদ্বারে গুটি হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মলদ্বারে গুটি একটি উপসর্গ, নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। একই ধরনের গুটি পাইলস, ফিশার, ফিস্টুলা, স্কিন ট্যাগ বা অ্যাবসেসের কারণে হতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অন্য সমস্যাও থাকতে পারে।

তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিজে থেকে “এটি পাইলস” ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একজন অভিজ্ঞ মলদ্বার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যার কারণ নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন।

Dr. Faridul Islam রোগীর মলদ্বারের সমস্যা, পাইলস, ফিশার, ফিস্টুলা এবং সংশ্লিষ্ট উপসর্গ মূল্যায়ন করে রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।

উপসংহার

মলদ্বারে গুটি হলে অবহেলা করা উচিত নয়, আবার অযথা আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। পাইলস, ফিশার, ফিস্টুলা, স্কিন ট্যাগ বা অ্যাবসেস—বিভিন্ন কারণে এই সমস্যা হতে পারে। সঠিক কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা নিলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব।কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত পানি পান, আঁশযুক্ত খাবার এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে গুটি দীর্ঘদিন থাকলে, বারবার হলে, ব্যথা-পুঁজ-রক্তপাত থাকলে বা দ্রুত বড় হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।