মলদ্বারে চুলকানি

মলদ্বারে চুলকানি

মলদ্বারে চুলকানি একটি সাধারণ কিন্তু অস্বস্তিকর সমস্যা। অনেক সময় সামান্য চুলকানি মনে হলেও বারবার চুলকানোর কারণে মলদ্বারের চারপাশের ত্বকে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব, ক্ষত বা ফোলা তৈরি হতে পারে। মলদ্বারে চুলকানি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। পাইলস, অতিরিক্ত ঘাম, অপরিষ্কার থাকা, অতিরিক্ত পরিষ্কার করা, ত্বকের সমস্যা, কৃমি, ফিশার বা মলদ্বারের সংক্রমণ এর সম্ভাব্য কারণ।

অনেকেই লজ্জার কারণে মলদ্বারে চুলকানির বিষয়টি চিকিৎসকের কাছে বলতে চান না। ফলে দীর্ঘদিন সমস্যা চলতে থাকে। চুলকানি বারবার হলে বা এর সঙ্গে রক্তপাত, ব্যথা, গুটি, ফোলা, পুঁজ কিংবা ত্বকে ক্ষত দেখা দিলে কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

মলদ্বারে চুলকানি কেন হয়?

মলদ্বারে চুলকানির অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • পাইলস বা অর্শ
  • মলদ্বারের আশপাশে অতিরিক্ত ঘাম
  • মলত্যাগের পর ভালোভাবে পরিষ্কার না করা
  • অতিরিক্ত সাবান বা সুগন্ধিযুক্ত পণ্য ব্যবহার
  • ডায়রিয়া বা ঘন ঘন পায়খানা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • মলদ্বারের ত্বকের অ্যালার্জি বা ডার্মাটাইটিস
  • কৃমির সংক্রমণ
  • ফাঙ্গাল বা অন্যান্য সংক্রমণ
  • এনাল ফিশার
  • ফিস্টুলা বা স্থানীয় প্রদাহ
  • মলদ্বারে দীর্ঘদিনের আর্দ্রতা

চুলকানির সঠিক কারণ না জেনে নিজের মতো করে ক্রিম বা ওষুধ ব্যবহার করলে কখনো কখনো সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

পাইলসের কারণে মলদ্বারে চুলকানি

পাইলস বা Hemorrhoids-এর অন্যতম উপসর্গ হতে পারে মলদ্বারে চুলকানি। পাইলস হলে মলদ্বারের আশপাশে ফোলা, মল বা মিউকাসের সামান্য নিঃসরণ এবং ত্বকে আর্দ্রতা তৈরি হওয়ার কারণে চুলকানি হতে পারে।

পাইলসের সঙ্গে আরও দেখা যেতে পারে—

  • মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া
  • মলদ্বারে গুটি
  • জ্বালাপোড়া
  • ব্যথা বা অস্বস্তি
  • পায়ুপথে চাপ অনুভব
  • মাংস বের হয়ে আসা

পাইলসের চিকিৎসা নির্ভর করে এর ধরন ও পর্যায়ের ওপর। শুধু চুলকানি কমানোর চেষ্টা না করে পাইলস থাকলে মূল সমস্যার চিকিৎসা করা গুরুত্বপূর্ণ।

কৃমির কারণে মলদ্বারে চুলকানি

বিশেষ করে রাতে মলদ্বারের চারপাশে বেশি চুলকানি হলে কিছু ধরনের কৃমির সংক্রমণের কথা বিবেচনা করা হয়। শিশুদের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যেতে পারে, তবে বড়দেরও হতে পারে।

কৃমির সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা বা উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। পরিবারের একাধিক সদস্যের একই ধরনের সমস্যা থাকলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত পরিষ্কার করার কারণে চুলকানি

মলদ্বার পরিষ্কার রাখা জরুরি, কিন্তু অতিরিক্ত পরিষ্কার করাও ক্ষতিকর হতে পারে। বারবার সাবান ব্যবহার, শক্তভাবে ঘষা বা সুগন্ধিযুক্ত ওয়েট ওয়াইপ ব্যবহার করলে মলদ্বারের সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা ও শুষ্কতা তৈরি হতে পারে।

মলত্যাগের পর পরিষ্কার করার সময় অতিরিক্ত ঘষাঘষি না করে পানি দিয়ে পরিষ্কার করে আলতোভাবে শুকিয়ে নেওয়া ভালো।

ঘাম ও আর্দ্রতার কারণে চুলকানি

মলদ্বারের চারপাশে দীর্ঘ সময় ঘাম বা আর্দ্রতা থাকলে ত্বকে জ্বালাপোড়া ও চুলকানি হতে পারে। গরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, আঁটসাঁট পোশাক বা দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে এ সমস্যা বাড়তে পারে।

তাই ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক পোশাক পরা এবং মলদ্বারের চারপাশ শুকনো রাখা উপকারী।

ফাঙ্গাল বা সংক্রমণের কারণে চুলকানি

মলদ্বারের চারপাশে ফাঙ্গাল বা অন্যান্য সংক্রমণ হলে চুলকানি, লালচে ভাব, জ্বালাপোড়া বা ত্বকের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো আক্রান্ত স্থান ধীরে ধীরে ছড়িয়েও যেতে পারে।

এ ধরনের সমস্যায় নিজের মতো করে স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম বা মিশ্র ক্রিম ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। কারণ ভুল ক্রিম ব্যবহারে সংক্রমণ আরও খারাপ হতে পারে বা রোগের লক্ষণ সাময়িকভাবে ঢেকে যেতে পারে।

ফিশারের কারণে চুলকানি

এনাল ফিশার হলো মলদ্বারের ভেতরের আবরণে তৈরি হওয়া একটি ছোট ফাটল বা ক্ষত। সাধারণত শক্ত পায়খানা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে এটি হতে পারে।

ফিশারের প্রধান উপসর্গ হলো মলত্যাগের সময় ব্যথা। এর পাশাপাশি মলদ্বারে জ্বালাপোড়া, অস্বস্তি ও চুলকানি এবং কখনো উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা দিতে পারে।

ফিশারের চিকিৎসায় কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ ও মল নরম রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

মলদ্বারে চুলকানির সঙ্গে কোন লক্ষণগুলো থাকতে পারে?

চুলকানির কারণ অনুযায়ী অন্যান্য উপসর্গও দেখা দিতে পারে। যেমন—

  • মলদ্বারে জ্বালাপোড়া
  • লালচে বা শুষ্ক ত্বক
  • মলদ্বারে গুটি
  • ফোলা
  • ব্যথা
  • মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া
  • পুঁজ বা তরল বের হওয়া
  • ত্বকে ক্ষত
  • রাতে বেশি চুলকানি
  • মলত্যাগের পর চুলকানি বেড়ে যাওয়া

চুলকানির সঙ্গে এসব উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মলদ্বারে চুলকানি হলে কী করবেন?

মলদ্বারে চুলকানি হলে প্রথমে কিছু সাধারণ যত্ন নেওয়া যেতে পারে।

১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন

মলত্যাগের পর পানি দিয়ে মলদ্বার পরিষ্কার করুন। তবে অতিরিক্ত ঘষাঘষি করবেন না।

২. স্থানটি শুকনো রাখুন

পরিষ্কার করার পর নরম কাপড় বা টিস্যু দিয়ে আলতোভাবে শুকিয়ে নিন। দীর্ঘ সময় ভেজা বা ঘামে ভেজা অবস্থায় থাকা এড়িয়ে চলুন।

৩. সাবানের ব্যবহার কমান

সুগন্ধিযুক্ত সাবান, স্প্রে বা অন্যান্য রাসায়নিক পণ্য মলদ্বারের সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহার না করাই ভালো।

৪. ঢিলেঢালা পোশাক পরুন

আরামদায়ক ও বাতাস চলাচল করে এমন অন্তর্বাস ও পোশাক ব্যবহার করলে অতিরিক্ত ঘাম কমতে পারে।

৫. চুলকানো এড়িয়ে চলুন

বারবার চুলকালে ত্বকে ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৬. কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ করুন

আঁশযুক্ত খাবার ও পর্যাপ্ত পানি গ্রহণের মাধ্যমে মল নরম রাখার চেষ্টা করুন।

মলদ্বারে চুলকানির চিকিৎসা

চিকিৎসা চুলকানির কারণের ওপর নির্ভর করে। প্রথমে চিকিৎসক উপসর্গ ও আক্রান্ত স্থান পরীক্ষা করে সম্ভাব্য কারণ নির্ণয় করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হতে পারে।

পাইলসের কারণে চুলকানি হলে পাইলসের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফিশার থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। কৃমির সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃমিনাশক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ফাঙ্গাল বা অন্য কোনো সংক্রমণ থাকলে কারণ অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা প্রয়োজন। ত্বকের অ্যালার্জি বা ডার্মাটাইটিস হলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।

তাই মলদ্বারে চুলকানি হলেই যেকোনো একটি ক্রিম ব্যবহার করা সঠিক পদ্ধতি নয়।

মলদ্বারে চুলকানির ঘরোয়া চিকিৎসা

হালকা চুলকানির ক্ষেত্রে মলদ্বার পরিষ্কার ও শুকনো রাখা, সুগন্ধিযুক্ত পণ্য এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত ঘষাঘষি না করা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ করা সহায়ক হতে পারে।

উষ্ণ পানিতে কিছুক্ষণ বসে থাকা অনেকের ক্ষেত্রে মলদ্বারের অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে চুলকানি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় বা বারবার ফিরে আসে, শুধু ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

নিচের যেকোনো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

  • কয়েকদিনের বেশি চুলকানি থাকা
  • বারবার চুলকানি ফিরে আসা
  • রাতে তীব্র চুলকানি
  • মলদ্বার থেকে রক্ত পড়া
  • মলদ্বারে গুটি বা ফোলা
  • তীব্র ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
  • পুঁজ বা তরল বের হওয়া
  • ত্বকে ক্ষত বা ঘা হওয়া
  • জ্বরের সঙ্গে মলদ্বারে সমস্যা
  • ঘরোয়া যত্নে সমস্যা না কমা

Dr. Faridul Islam-এর পরামর্শ

Dr. Faridul Islam-এর পরামর্শ অনুযায়ী, মলদ্বারে চুলকানি দীর্ঘদিন থাকলে শুধু চুলকানি কমানোর ওষুধ ব্যবহার না করে এর কারণ শনাক্ত করা জরুরি। কারণ পাইলস, ফিশার, কৃমি, ত্বকের সমস্যা বা সংক্রমণ—বিভিন্ন কারণে একই উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

মলদ্বারে চুলকানির সঙ্গে রক্তপাত, ব্যথা, গুটি, ফোলা বা পুঁজ থাকলে একজন উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রোগের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করলে সমস্যাটি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

মলদ্বারে চুলকানি প্রতিরোধের উপায়

মলদ্বারে চুলকানি প্রতিরোধে কয়েকটি অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ—

  • মলত্যাগের পর পরিষ্কার পানি দিয়ে মলদ্বার পরিষ্কার করুন
  • অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার করবেন না
  • মলদ্বারের চারপাশ শুকনো রাখুন
  • ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক পোশাক পরুন
  • কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন
  • আঁশযুক্ত খাবার খান
  • মলদ্বার বারবার চুলকানো এড়িয়ে চলুন
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ক্রিম দীর্ঘদিন ব্যবহার করবেন না

উপসংহার

মলদ্বারে চুলকানি সাধারণ সমস্যা হলেও এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। পাইলস, ফিশার, কৃমি, ত্বকের সমস্যা, অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা সংক্রমণের কারণে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই চুলকানি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা এর সঙ্গে রক্তপাত, ব্যথা, গুটি, ফোলা কিংবা পুঁজ থাকলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, মল নরম রাখা এবং মলদ্বারের ত্বকের প্রতি যত্নশীল হওয়া মলদ্বারে চুলকানি কমাতে ও পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।