পাইলসের রক্ত পড়া বন্ধ করার উপায়

পাইলসের রক্ত পড়া বন্ধ করার উপায় – কারণ, ঘরোয়া যত্ন ও চিকিৎসা

পাইলস বা অর্শ রোগের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়া। অনেক সময় পায়খানার পর টিস্যু পেপারে উজ্জ্বল লাল রক্ত দেখা যায়, আবার কখনো মলের গায়ে রক্ত লেগে থাকতে পারে। এই সমস্যা দেখা দিলে অনেকেই ভয় পেয়ে যান এবং দ্রুত পাইলসের রক্ত পড়া বন্ধ করার উপায় খুঁজতে থাকেন।

পাইলসের কারণে রক্তপাত হলে সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লেই যে সেটি পাইলসের কারণে হচ্ছে, তা নিশ্চিত নয়। অ্যানাল ফিশার, অন্ত্রের প্রদাহ, পলিপসহ অন্যান্য রোগেও রক্তপাত হতে পারে।

তাই রক্তপাতের কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আর্টিকেলে পাইলসের রক্ত পড়ার কারণ, রক্তপাত কমানোর উপায়, ঘরোয়া যত্ন এবং আধুনিক চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

পাইলসের রক্ত পড়ার কারণ কী?

পাইলস হলো মলদ্বার ও মলাশয়ের নিচের অংশের রক্তনালি-সমৃদ্ধ টিস্যুর ফোলা ও সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন। অভ্যন্তরীণ পাইলসের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্ত পড়তে পারে। এর কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো:

১. কোষ্ঠকাঠিন্য

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে মল শক্ত হয়ে যায়। শক্ত মল বের করার সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়, যা পাইলসের উপসর্গ বাড়িয়ে রক্তপাত ঘটাতে পারে।

২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া

দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা বা জোর করে মলত্যাগের চেষ্টা করলে মলদ্বারের ওপর চাপ বাড়ে। এতে পাইলসের রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৩. আঁশযুক্ত খাবারের অভাব

খাবারে শাকসবজি, ফলমূল ও পূর্ণশস্যের পরিমাণ কম থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এর ফলে মলত্যাগে চাপ বাড়ে এবং পাইলসের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।

৪. দীর্ঘদিনের পাইলস

দীর্ঘদিন পাইলস থাকলে বারবার রক্তপাত হতে পারে। রক্তপাত চলতে থাকলে রক্তস্বল্পতাও দেখা দিতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ: রক্তপাতের সঙ্গে পেটব্যথা, মলের অভ্যাস পরিবর্তন, অকারণে ওজন কমে যাওয়া বা কালো মল দেখা দিলে অন্য কোনো রোগের সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে।

পাইলসের রক্ত পড়া বন্ধ করার ৭টি উপায়

১. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করুন

পাইলসের রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে মল নরম রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্ত মল বের করার সময় চাপ কম হলে মলদ্বারের টিস্যুতে আঘাত লাগার ঝুঁকিও কমতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন:

  • শাকসবজি ও ফলমূল।
  • ডাল ও পূর্ণশস্যজাতীয় খাবার।
  • আঁশযুক্ত অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার।
  • পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য উপযুক্ত তরল।

প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ইসবগুল বা মল নরম করার ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। ইসবগুল গ্রহণের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি, যদি চিকিৎসক তরল গ্রহণ সীমিত করার নির্দেশ না দিয়ে থাকেন।

২. মলত্যাগের সময় চাপ দেবেন না

মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া এবং দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা এড়িয়ে চলুন। মলত্যাগের বেগ চেপে রাখবেন না। নিয়মিত সময়ে মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৩. কুসুম গরম পানিতে বসুন

মলদ্বারে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া থাকলে পরিষ্কার কুসুম গরম পানিতে ১০–১৫ মিনিট বসলে সাময়িক আরাম পাওয়া যেতে পারে। দিনে কয়েকবার এটি করা যায়।

তবে কুসুম গরম পানিতে বসা রক্তপাত বন্ধ করার নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। রক্তপাত চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৪. মলদ্বারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন

মলত্যাগের পর মলদ্বার আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। অতিরিক্ত ঘষাঘষি, সুগন্ধিযুক্ত ওয়াইপ বা ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করে এমন পণ্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

পরিষ্কার করার পর নরম কাপড় দিয়ে আলতোভাবে শুকিয়ে নিন। এতে ত্বকের জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি কমতে পারে।

৫. নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার করবেন না

পাইলসের রক্তপাত বন্ধ করতে অনেকে বিভিন্ন ক্রিম, সাপোজিটরি বা ব্যথানাশক ব্যবহার করেন। কিন্তু সব ওষুধ সবার জন্য উপযুক্ত নয়।

বিশেষ করে রক্তপাতের সময় নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কিছু ব্যথানাশক রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।

৬. নিয়মিত হাঁটাচলা করুন

নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটুন এবং দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকার মাঝে বিরতি নিন।

৭. রক্তপাতের কারণ নির্ণয় করুন

রক্তপাত বারবার হলে শুধু ঘরোয়া যত্নের ওপর নির্ভর করবেন না। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী মলদ্বার পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, অ্যানোস্কোপি বা কোলনোস্কোপির পরামর্শ দিতে পারেন।

সঠিক কারণ নির্ণয় করাই কার্যকর চিকিৎসার প্রথম ধাপ।

পাইলসের রক্তপাতের আধুনিক চিকিৎসা

পাইলসের রক্তপাতের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের মাত্রা, রক্তপাতের পরিমাণ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর।

ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা

প্রাথমিক পর্যায়ে আঁশযুক্ত খাবার, কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহারে উপকার পাওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার হওয়া রক্তপাতের ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ যথেষ্ট নাও হতে পারে।

রাবার ব্যান্ড লাইগেশন

নির্বাচিত অভ্যন্তরীণ পাইলসের ক্ষেত্রে রাবার ব্যান্ড লাইগেশন ব্যবহার করা হয়। এতে পাইলসের গোড়ায় একটি ছোট ব্যান্ড লাগিয়ে রক্ত সরবরাহ কমানো হয়। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে এই পদ্ধতি উপযুক্ত কি না নির্ধারণ করেন।

ইনফ্রারেড কোয়াগুলেশন

কিছু অভ্যন্তরীণ পাইলসের ক্ষেত্রে ইনফ্রারেড কোয়াগুলেশন ব্যবহার করা হয়। এতে তাপের সাহায্যে পাইলসের টিস্যুতে পরিবর্তন ঘটিয়ে রক্তপাত কমানোর চেষ্টা করা হয়।

লেজার বা অস্ত্রোপচার

নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে লেজার-ভিত্তিক চিকিৎসা বিবেচনা করা যেতে পারে। গুরুতর, বড় বা অন্যান্য চিকিৎসায় উন্নতি না হওয়া পাইলসের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

কোন পদ্ধতি সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, তা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। লেজার চিকিৎসা সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয় এবং সব ক্ষেত্রে অন্য পদ্ধতির চেয়ে ভালো—এমন নিশ্চয়তা নেই।

পাইলসের রক্ত পড়লে কী খাবেন?

রক্তপাতের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে।

যেসব খাবার উপকারী:

  • পেঁপে, নাশপাতি, কমলাসহ বিভিন্ন ফল।
  • লালশাক, পালংশাক ও অন্যান্য শাকসবজি।
  • ডাল, ওটস ও পূর্ণশস্য।
  • পর্যাপ্ত পানি, যদি চিকিৎসাগত কারণে পানি সীমিত করার নির্দেশ না থাকে।

অতিরিক্ত ঝাল খাবার কারও কারও মলদ্বারের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিজের উপসর্গ অনুযায়ী খাবার নির্বাচন করুন। তবে শুধু ঝাল খাবার পাইলসের মূল কারণ—এমন প্রমাণ নেই।

পাইলসের রক্তপাত হলে কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?

নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন:

  • প্রচুর রক্তপাত বা রক্তপাত বন্ধ না হওয়া।
  • মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত দুর্বলতা।
  • কালো, আলকাতরার মতো মল।
  • রক্তপাতের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা।
  • বারবার রক্তপাত বা অকারণে ওজন কমে যাওয়া।

প্রচুর রক্তপাত বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি বিভাগে যান।

পাইলসের রক্তপাত প্রতিরোধের উপায়

পাইলসের উপসর্গ ও রক্তপাতের ঝুঁকি কমাতে কিছু অভ্যাস অনুসরণ করুন:

১. প্রতিদিন আঁশযুক্ত খাবার খান।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

৩. নিয়মিত হাঁটাচলা করুন।

৪. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।

৫. দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকবেন না।

৬. কোষ্ঠকাঠিন্য দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসা নিন।

৭. রক্তপাত হলে নিজে থেকে পাইলস ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডা. ফরিদুল ইসলামের পরামর্শ

পাইলসের রক্তপাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগ নির্ণয়। মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়া পাইলসের লক্ষণ হতে পারে, তবে অ্যানাল ফিশার এবং অন্ত্রের অন্যান্য রোগেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তাই রক্তপাত বারবার হলে বা অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডা. ফরিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে প্রকাশিত এই স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখাটি রোগীদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে তৈরি। ওয়েবসাইটে চিকিৎসকের যোগ্যতা, বিশেষজ্ঞ পরিচয়, কর্মস্থল ও সেবার বিবরণ প্রকাশের আগে যাচাই করে নিন।

উপসংহার

পাইলসের রক্ত পড়া বন্ধ করার জন্য কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং মলত্যাগের সময় চাপ এড়িয়ে চলা সহায়ক হতে পারে। তবে রক্তপাতের প্রকৃত কারণ নির্ণয় না করে শুধু ঘরোয়া পদ্ধতি বা ওষুধের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।সঠিক রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে পাইলসের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। রক্তপাত বেশি হলে, বারবার হলে বা দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।