পাইলস কমানোর উপায়

পাইলস কমানোর উপায়

পাইলস বা অর্শ একটি পরিচিত মলদ্বারজনিত সমস্যা। এই রোগে মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া, মলদ্বারে চুলকানি, ব্যথা, ফোলা কিংবা মাংসপিণ্ডের মতো কিছু বের হয়ে আসার সমস্যা হতে পারে। অনেকেই পাইলসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত আরাম পাওয়ার উপায় খোঁজেন। সঠিক খাবার, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে পাইলসের উপসর্গ কমানো সম্ভব।

তবে মনে রাখতে হবে, সব ধরনের মলদ্বারের ব্যথা বা রক্তপাত পাইলসের কারণে হয় না। তাই দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

পাইলস কী এবং কেন হয়?

মলদ্বার ও পায়ুপথের আশপাশে থাকা রক্তনালির গুচ্ছ ফুলে গেলে বা স্ফীত হলে তাকে পাইলস বা হেমোরয়েডস বলা হয়। এটি সাধারণত দুই ধরনের—ইন্টারনাল পাইলস বা ভেতরের পাইলস এবং এক্সটারনাল পাইলস বা বাইরের পাইলস।

পাইলস হওয়ার সাধারণ কারণ ও ঝুঁকিগুলো হলো:

  • দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা।
  • মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া।
  • দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকা।
  • খাবারে পর্যাপ্ত আঁশের অভাব।
  • পর্যাপ্ত পানি পান না করা।
  • দীর্ঘদিন শারীরিক পরিশ্রম বা চলাফেরা কম করা।
  • গর্ভাবস্থায় পেটের ভেতরে চাপ বৃদ্ধি পাওয়া।

পাইলস কমানোর ৭টি কার্যকর উপায়

১. আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান

পাইলস কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা। আঁশযুক্ত খাবার মল নরম রাখতে এবং সহজে মলত্যাগ করতে সাহায্য করে। ফলে মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার প্রয়োজন কমে।

প্রতিদিনের খাবারে রাখতে পারেন:

  • শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের সবজি।
  • পেয়ারা, নাশপাতি, আপেলসহ আঁশযুক্ত ফল।
  • ডাল, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার।
  • ওটস ও লাল আটার রুটি।
  • পরিমিত পরিমাণে অন্যান্য পূর্ণশস্যজাতীয় খাবার।

খাবারে আঁশ ধীরে ধীরে বাড়ান। হঠাৎ অনেক বেশি আঁশ খেলে পেট ফাঁপা বা গ্যাস হতে পারে।

২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ মল নরম রাখতে সাহায্য করে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য কমতে পারে এবং মলত্যাগের সময় চাপ দেওয়ার প্রবণতা কমে।

তবে কিডনি, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো কারণে চিকিৎসক পানি সীমিত রাখতে বললে সেই নির্দেশনা মেনে চলুন।

৩. কুসুম গরম পানিতে বসুন

মলদ্বারে ব্যথা, অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া থাকলে পরিষ্কার কুসুম গরম পানিতে ১০–১৫ মিনিট বসে থাকা আরাম দিতে পারে। দিনে কয়েকবার, বিশেষ করে মলত্যাগের পরে, এটি করা যেতে পারে।

পানি যেন অতিরিক্ত গরম না হয়। এতে ত্বক পুড়ে যেতে পারে। পানি ব্যবহারের পর জায়গাটি আলতোভাবে শুকিয়ে নিন।

৪. মলত্যাগের সময় চাপ দেবেন না

মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিলে পাইলসের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে। তাই মলত্যাগের বেগ হলে দেরি করবেন না। টয়লেটে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে করতে বসে থাকার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।

মল শক্ত হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ফাইবার সাপ্লিমেন্ট বা মল নরম করার ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. নিয়মিত হাঁটাচলা করুন

নিয়মিত হাঁটা ও হালকা শারীরিক কার্যকলাপ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। প্রতিদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটুন এবং দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকলে মাঝেমধ্যে উঠে চলাফেরা করুন।

তবে ব্যথা বা ফোলা বেশি থাকলে এমন ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন, যাতে মলদ্বারে চাপ বা অস্বস্তি বেড়ে যায়।

৬. মলদ্বারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন

মলত্যাগের পর মলদ্বার পরিষ্কার পানি দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। জোরে ঘষাঘষি, সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে এমন পণ্য ব্যবহার করবেন না।

মলদ্বারে লেবুর রস, রসুন, টুথপেস্ট বা অপরীক্ষিত ভেষজ উপাদান লাগাবেন না। এগুলো ত্বকে জ্বালা, ক্ষত বা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৭. প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন

খাবার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে অনেকের পাইলসের উপসর্গ কমে। কিন্তু সমস্যা বেশি হলে বা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

উপসর্গ ও পাইলসের মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধ, রাবার ব্যান্ড লিগেশন, ইনফ্রারেড কোয়াগুলেশন বা অস্ত্রোপচারের মতো চিকিৎসা বিবেচনা করতে পারেন। সব রোগীর অস্ত্রোপচার লাগে না; আবার সব পাইলস শুধু ঘরোয়া যত্নে সারে না।

পাইলসের ফোলা ও ব্যথা কমানোর উপায়

পাইলসের কারণে মলদ্বারে ফোলা বা ব্যথা হলে প্রথমে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ, কুসুম গরম পানিতে বসা এবং মলত্যাগের সময় চাপ না দেওয়ার দিকে মনোযোগ দিন। প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যথানাশক বা স্থানীয় ওষুধ সম্পর্কে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মলদ্বারের বাইরে হঠাৎ খুব ব্যথাযুক্ত গুটি দেখা দিলে সেটি রক্ত জমাট বাঁধা পাইলসসহ অন্য সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। নিজে থেকে গুটি কাটবেন না বা চেপে ধরবেন না।

পাইলস হলে কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?

পাইলসের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই খাবার নিষিদ্ধ নয়। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে এমন খাদ্যাভ্যাস কমানো উপকারী। যেমন:

  • অতিরিক্ত পরিমাণে কম আঁশযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার।
  • শাকসবজি ও ফলের পরিবর্তে নিয়মিত শুধু পরিশোধিত শস্যজাতীয় খাবার খাওয়া।
  • পর্যাপ্ত তরল না খাওয়া।
  • এমন খাবার যা খেলে ব্যক্তিগতভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অস্বস্তি বেড়ে যায়।

ঝাল খাবার সবার পাইলস বাড়ায় না। তবে ঝাল খাবারে আপনার জ্বালাপোড়া বাড়লে তা কমিয়ে দিন।

কখন পাইলসের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লে প্রথমবারেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো, কারণ রক্তপাতের অন্য কারণও থাকতে পারে। বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন:

  • বারবার বা বেশি পরিমাণে রক্তপাত।
  • মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি।
  • কালো, আলকাতরার মতো মল।
  • তীব্র ব্যথা, জ্বর, পুঁজ বা দ্রুত বাড়তে থাকা ফোলা।
  • মলত্যাগের অভ্যাসে নতুন পরিবর্তন বা অকারণে ওজন কমে যাওয়া।

প্রচুর রক্তপাত, অজ্ঞান হওয়া বা তীব্র অসুস্থতা দেখা দিলে জরুরি বিভাগে যান।

ডা. ফরিদুল ইসলামের পরামর্শে পাইলসের চিকিৎসা

পাইলসের উপসর্গ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বা ঘরোয়া যত্নে উন্নতি না হলে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে সঠিক রোগ নির্ণয় করানো গুরুত্বপূর্ণ। রোগের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্বাচন করা উচিত। ডা. ফরিদুল ইসলামের নাম ও সেবা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের আগে তাঁর প্রকৃত যোগ্যতা, কর্মস্থল এবং চিকিৎসাসেবার বিবরণ যাচাই করে নিন।

উপসংহার

পাইলস কমানোর জন্য আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ, কুসুম গরম পানিতে বসা এবং মলত্যাগের সময় চাপ না দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভ্যাস উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে রক্তপাত, তীব্র ব্যথা বা বারবার ফোলা দেখা দিলে শুধু ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করবেন না। সঠিক রোগ নির্ণয় ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাই দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে ভালো উপায়।