পায়ুপথে মাংস বের হলে করণীয়
মলত্যাগের সময় পায়ুপথ দিয়ে মাংসের মতো কিছু বের হয়ে আসা অনেকের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কেউ এটিকে পাইলস মনে করেন, আবার কেউ ভাবেন এটি বড় কোনো রোগের লক্ষণ। আসলে পায়ুপথ দিয়ে মাংস বা গুটি বের হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। পাইলস, বিশেষ করে প্রোল্যাপ্সড হেমোরয়েড, এর একটি সাধারণ কারণ। তবে রেক্টাল প্রোল্যাপস, অ্যানাল স্কিন ট্যাগ বা অন্য কোনো সমস্যার কারণেও এমন হতে পারে।
তাই পায়ুপথে মাংস বের হলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে সমস্যাটির কারণ জানা গুরুত্বপূর্ণ। কখন মাংস বের হয়, নিজে থেকে ভেতরে ঢুকে যায় কি না, হাতে ঢোকাতে হয় কি না, রক্তপাত বা ব্যথা আছে কি না—এসব তথ্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
পায়ুপথে মাংস বের হওয়ার কারণ
১. প্রোল্যাপ্সড পাইলস
পাইলস বা হেমোরয়েড হলো মলদ্বার ও পায়ুপথের রক্তনালির ফুলে যাওয়া। পাইলস বড় হয়ে গেলে মলত্যাগের সময় ভেতরের অংশ বাইরে বের হয়ে আসতে পারে। এটিকে প্রোল্যাপ্সড হেমোরয়েড বলা হয়।
এক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় মাংসের মতো অংশ বের হতে পারে এবং পরে নিজে থেকে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। রোগের মাত্রা বাড়লে কখনো হাত দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে হতে পারে।
পাইলসের সঙ্গে উজ্জ্বল লাল রক্তপাত, চুলকানি, অস্বস্তি বা পায়ুপথে চাপ অনুভূত হতে পারে।
২. রেক্টাল প্রোল্যাপস
রেক্টামের একটি অংশ পায়ুপথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলে তাকে রেক্টাল প্রোল্যাপস বলা হয়। এটি পাইলসের থেকে আলাদা একটি সমস্যা।
রেক্টাল প্রোল্যাপসে মলত্যাগ বা অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার সময় মাংসল অংশ বের হয়ে আসতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দাঁড়ালে বা হাঁটলেও অংশটি বাইরে দেখা যেতে পারে।
৩. অ্যানাল স্কিন ট্যাগ
পায়ুপথের আশেপাশে অতিরিক্ত ত্বকের ছোট অংশ তৈরি হলে তাকে স্কিন ট্যাগ বলা হয়। এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়। পুরোনো পাইলস বা ফিশারের পরও অতিরিক্ত ত্বক থাকতে পারে।
স্কিন ট্যাগ সাধারণত সব সময় বাইরে থাকে এবং মলত্যাগের সময় নতুন করে বের হয়ে আসে না।
৪. দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য
কঠিন মল বের করার সময় বারবার অতিরিক্ত চাপ দিতে হলে পাইলস বা অন্যান্য পায়ুপথের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে পায়ুপথ দিয়ে কিছু বের হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পায়ুপথে মাংস বের হলে কী কী লক্ষণ থাকতে পারে?
মূল কারণ অনুযায়ী বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- মলত্যাগের সময় মাংস বা গুটি বের হওয়া
- মলত্যাগ শেষ হলে অংশটি নিজে থেকে ভেতরে ঢুকে যাওয়া
- হাত দিয়ে ভেতরে ঢোকাতে হওয়া
- পায়ুপথে রক্ত পড়া
- পায়ুপথে চুলকানি
- জ্বালাপোড়া
- ব্যথা বা অস্বস্তি
- পায়ুপথে চাপ অনুভব
- মল পুরোপুরি বের না হওয়ার অনুভূতি
- পায়ুপথে অতিরিক্ত ফোলা
- মিউকাস বা শ্লেষ্মা বের হওয়া
সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না।
পায়ুপথে মাংস বের হলে প্রথমে কী করবেন?
পায়ুপথে মাংস বের হলে আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করা উচিত।
কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন
মল শক্ত হলে মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিতে হয়। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও অন্যান্য ফাইবারযুক্ত খাবার রাখুন।
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না
দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং জোর করে মলত্যাগ করার অভ্যাস পাইলসের উপসর্গ বাড়াতে পারে। মলত্যাগের স্বাভাবিক চাপ এলে টয়লেটে যাওয়া ভালো।
দীর্ঘ সময় টয়লেটে বসে থাকবেন না
টয়লেটে বসে মোবাইল ব্যবহার করা বা দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন
মলত্যাগের পর পায়ুপথ পরিষ্কার রাখুন এবং অতিরিক্ত ঘষাঘষি করবেন না। পায়ুপথের আশেপাশের অংশ শুকনো রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিজে থেকে গুটি বা মাংস কেটে ফেলবেন না
পায়ুপথ থেকে বের হওয়া অংশ নিজে কেটে ফেলা বা কোনো ধারালো বস্তু দিয়ে সরানোর চেষ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে রক্তপাত ও সংক্রমণ হতে পারে।
পায়ুপথে বের হওয়া মাংস কি পাইলস?
সবসময় নয়। পাইলসের কারণে মাংসের মতো অংশ বের হতে পারে, কিন্তু একই ধরনের উপসর্গ রেক্টাল প্রোল্যাপস বা অন্য সমস্যাতেও দেখা যেতে পারে।
সাধারণভাবে—
প্রোল্যাপ্সড পাইলস:
মলত্যাগের সময় বের হতে পারে এবং রোগের মাত্রা অনুযায়ী নিজে থেকে বা হাতে চাপ দিয়ে ভেতরে যেতে পারে।
রেক্টাল প্রোল্যাপস:
রেক্টামের অংশ বাইরে চলে আসে এবং মাংসল বা লালচে অংশের মতো দেখা যেতে পারে। এর সঙ্গে মলত্যাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বা মল পুরোপুরি বের না হওয়ার অনুভূতিও থাকতে পারে।
তবে শুধু দেখে নিশ্চিতভাবে পার্থক্য করা সবসময় সম্ভব নয়। চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- মাংস বের হয়ে আর ভেতরে না ঢোকা
- প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া
- অতিরিক্ত রক্তপাত
- বের হওয়া অংশ নীলচে, কালচে বা অস্বাভাবিক রঙের হওয়া
- পায়ুপথে দ্রুত ফোলা
- পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হওয়া
- জ্বর হওয়া
- মলত্যাগে গুরুতর সমস্যা হওয়া
- বারবার মাংস বের হয়ে আসা
বিশেষ করে বাইরে বের হয়ে আসা অংশ ভেতরে না ঢুকলে বা তীব্র ব্যথা ও রক্তপাত হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
পায়ুপথে মাংস বের হলে কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস নেবেন। যেমন—মাংস কখন বের হয়, মলত্যাগের সময় বের হয় কি না, নিজে থেকে ভেতরে যায় কি না, রক্তপাত বা ব্যথা আছে কি না ইত্যাদি।
এরপর পায়ুপথের শারীরিক পরীক্ষা করা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক করতে পারেন—
- Digital rectal examination
- Anoscopy
- Proctoscopy
- Colonoscopy বা অন্যান্য পরীক্ষা, উপসর্গ অনুযায়ী
- প্রয়োজনে imaging পরীক্ষা
সব রোগীর জন্য সব পরীক্ষা দরকার হয় না। সম্ভাব্য কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক পরীক্ষা নির্বাচন করেন।
পায়ুপথে মাংস বের হওয়ার চিকিৎসা
চিকিৎসা নির্ভর করে সমস্যাটির কারণ ও মাত্রার ওপর।
পাইলসের ক্ষেত্রে
প্রাথমিক পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, পর্যাপ্ত পানি পান, কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
যদি পাইলস প্রোল্যাপ্স করে এবং উপসর্গ বেশি হয়, চিকিৎসক রোগের ধরন ও গ্রেড অনুযায়ী বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি বিবেচনা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে নন-সার্জিক্যাল পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।
রেক্টাল প্রোল্যাপসের ক্ষেত্রে
রেক্টাল প্রোল্যাপসের চিকিৎসা রোগীর বয়স, প্রোল্যাপসের মাত্রা, অন্যান্য উপসর্গ এবং সামগ্রিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন করা হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে সার্জিক্যাল চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
স্কিন ট্যাগের ক্ষেত্রে
স্কিন ট্যাগ সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না যদি এটি কোনো সমস্যা তৈরি না করে। তবে অতিরিক্ত ত্বকের অংশে বারবার ঘর্ষণ, পরিষ্কার করতে সমস্যা বা অস্বস্তি হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
পায়ুপথে মাংস বের হওয়া প্রতিরোধের উপায়
সব ধরনের সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে—
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- ফাইবারযুক্ত খাবার খান।
- কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন।
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।
- টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না।
- নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম করুন।
- অতিরিক্ত ওজন থাকলে স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।
- পায়ুপথের কোনো সমস্যা হলে দীর্ঘদিন অবহেলা করবেন না।
Dr. Faridul Islam-এর পরামর্শ
পায়ুপথে মাংস বের হওয়া একটি উপসর্গ; এটি নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়। তাই পাইলস, ফিশার, রেক্টাল প্রোল্যাপস বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে এটি হচ্ছে কি না তা নির্ণয় করা জরুরি।
Dr. Faridul Islam পাইলস, ফিস্টুলা, ফিশার এবং পায়ুপথের অন্যান্য সমস্যার রোগীদের উপসর্গ ও রোগের ধরন অনুযায়ী মূল্যায়ন করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে পারেন। প্রয়োজনে রোগীর অবস্থার ভিত্তিতে নন-সার্জিক্যাল বা অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি বিবেচনা করা হয়।
উপসংহার
পায়ুপথে মাংস বের হলে সবসময় এটি পাইলস হবে এমন নয়। প্রোল্যাপ্সড হেমোরয়েড, রেক্টাল প্রোল্যাপস, স্কিন ট্যাগসহ বিভিন্ন কারণে এমন হতে পারে। তাই মাংস বা গুটি বের হওয়ার বিষয়টি বারবার ঘটলে অথবা এর সঙ্গে রক্তপাত, ব্যথা, ফোলা, পুঁজ বা মলত্যাগের সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা করলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা এবং দৈনন্দিন জীবনের অস্বস্তি কমানো সম্ভব। নিজের হাতে কোনো গুটি বা বের হয়ে আসা অংশ কেটে বা চাপ দিয়ে সরানোর চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।