পায়ুপথের ফাটলের চিকিৎসা
পায়ুপথের ফাটল বা অ্যানাল ফিশার একটি পরিচিত সমস্যা। এ সমস্যায় মলদ্বারের মুখের পাতলা ও সংবেদনশীল ত্বকে ছোট ফাটল বা ক্ষত তৈরি হয়। ফলে মলত্যাগের সময় তীব্র ব্যথা, জ্বালাপোড়া এবং টাটকা লাল রক্ত দেখা দিতে পারে। অনেক সময় মলত্যাগের পরও কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যথা থাকতে পারে।
পায়ুপথের ফাটল সাধারণত শক্ত মল, কোষ্ঠকাঠিন্য বা মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার কারণে হয়। সঠিক যত্ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে এটি ভালো হয়ে যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ফাটল থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পায়ুপথের ফাটল কী?
পায়ুপথের ফাটলকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যানাল ফিশার বলা হয়। এটি পায়ুপথের ভেতরের আবরণে তৈরি হওয়া ছোট একটি ছিঁড়ে যাওয়া ক্ষত। শক্ত মল বের হওয়ার সময় এই অংশে চাপ পড়ে এবং ফাটল তৈরি হতে পারে।
ফাটল নতুন হলে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সঠিক যত্নে ভালো হতে পারে। কিন্তু ক্ষত দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে দীর্ঘস্থায়ী অ্যানাল ফিশার হতে পারে, যার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
পায়ুপথে ফাটল হওয়ার কারণ
পায়ুপথে ফাটল হওয়ার কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো:
১. কোষ্ঠকাঠিন্য: শক্ত ও বড় মল পায়ুপথের ত্বকে আঘাত করতে পারে।
২. মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ: জোর করে মলত্যাগ করলে ফাটল তৈরি বা পুরোনো ক্ষত আরও খারাপ হতে পারে।
৩. বারবার পাতলা পায়খানা: ঘন ঘন পাতলা পায়খানার কারণে পায়ুপথের ত্বকে জ্বালা ও ক্ষত হতে পারে।
৪. কম আঁশযুক্ত খাবার: খাবারে আঁশের অভাব কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে।
৫. প্রসবজনিত চাপ: কিছু ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের সময় পায়ুপথের আশপাশে চাপ পড়ে ফাটল তৈরি হতে পারে।
কখনো কখনো অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ বা অন্য কিছু রোগের সঙ্গেও পায়ুপথের ফাটল দেখা দিতে পারে। তাই বারবার ফাটল হলে কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ।
পায়ুপথের ফাটলের লক্ষণ
অ্যানাল ফিশারের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- মলত্যাগের সময় কেটে যাওয়ার মতো তীব্র ব্যথা।
- মলত্যাগের পর জ্বালাপোড়া বা দীর্ঘ সময় ব্যথা থাকা।
- টয়লেট পেপার বা মলের গায়ে অল্প টাটকা লাল রক্ত দেখা।
- পায়ুপথে অস্বস্তি বা সংবেদনশীলতা।
- দীর্ঘস্থায়ী ফাটলের পাশে ছোট চামড়ার গুটি তৈরি হওয়া।
এই লক্ষণগুলো পাইলসসহ অন্যান্য সমস্যার ক্ষেত্রেও দেখা যেতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা যায় না।
পায়ুপথের ফাটলের চিকিৎসা
পায়ুপথের ফাটলের চিকিৎসা নির্ভর করে ক্ষত কতদিন ধরে আছে, ব্যথার তীব্রতা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য আছে কি না তার ওপর। সাধারণত প্রথমে মল নরম রাখা ও ক্ষত ভালো হওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়।
১. মল নরম রাখুন
পায়ুপথের ফাটল সারানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শক্ত মল ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ করা। মল নরম হলে ক্ষতস্থানে চাপ কম পড়ে এবং নতুন করে ফাটল তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও কমে।
প্রতিদিনের খাবারে রাখুন:
- শাকসবজি ও আঁশযুক্ত ফল।
- ডাল, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার।
- ওটস ও পূর্ণশস্যজাতীয় খাবার।
- প্রয়োজনে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে ইসবগুলের মতো ফাইবার সাপ্লিমেন্ট।
আঁশ ধীরে ধীরে বাড়ান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তবে চিকিৎসক যদি পানি সীমিত রাখতে বলে থাকেন, সেই নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
২. কুসুম গরম পানিতে বসুন
পরিষ্কার কুসুম গরম পানিতে ১০–১৫ মিনিট বসে থাকলে পায়ুপথের ব্যথা ও পেশির টান কমতে পারে। বিশেষ করে মলত্যাগের পর এটি আরাম দিতে পারে।
দিনে কয়েকবার এভাবে বসা যেতে পারে। পানি যেন অতিরিক্ত গরম না হয়। পরে নরম কাপড় দিয়ে আলতোভাবে শুকিয়ে নিন।
৩. মলত্যাগের সময় চাপ দেবেন না
মলত্যাগের বেগ হলে আটকে রাখবেন না। টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং জোর করে মলত্যাগের চেষ্টা করা এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত হাঁটাচলা করুন এবং দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকলে মাঝে মাঝে উঠে চলাফেরা করুন।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করুন
ফাটল দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসক কিছু নির্দিষ্ট মলম দিতে পারেন, যা পায়ুপথের পেশি শিথিল করে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে ও ক্ষত সারাতে সাহায্য করে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা কমানোর ওষুধ বা কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণের ওষুধও দেওয়া হতে পারে।
নির্দিষ্ট মলম সবার জন্য উপযুক্ত নয়। নিজে থেকে স্টেরয়েডযুক্ত মলম, অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার করবেন না। পায়ুপথে লেবু, রসুন, টুথপেস্ট বা অপরীক্ষিত ভেষজ উপাদান লাগানো থেকেও বিরত থাকুন।
৫. দীর্ঘস্থায়ী ফাটলে বিশেষ চিকিৎসা
সাধারণ যত্ন ও ওষুধে ফাটল ভালো না হলে চিকিৎসক অন্যান্য পদ্ধতি বিবেচনা করতে পারেন। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী বটুলিনাম টক্সিন ইনজেকশন বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
অস্ত্রোপচারের একটি পদ্ধতি হলো ল্যাটারাল ইন্টারনাল স্ফিঙ্কটেরোটমি। এতে পায়ুপথের নির্দিষ্ট পেশির টান কমিয়ে ক্ষত সারতে সাহায্য করা হয়। তবে এই পদ্ধতির ঝুঁকি ও উপকারিতা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সবার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না।
পায়ুপথের ফাটল ও পাইলসের পার্থক্য
পায়ুপথের ফাটল এবং পাইলসের কিছু লক্ষণ একই রকম হলেও রোগ দুটি আলাদা।
- অ্যানাল ফিশার: মলত্যাগের সময় কেটে যাওয়ার মতো ব্যথা ও জ্বালাপোড়া বেশি দেখা যায়। কখনো অল্প টাটকা রক্ত পড়ে।
- পাইলস: মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়া, চুলকানি, ফোলা বা মাংসপিণ্ড বের হয়ে আসার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। ভেতরের পাইলসে অনেক সময় ব্যথা থাকে না।
দুটি সমস্যা একই সঙ্গে থাকতে পারে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
মলদ্বারে ব্যথা বা রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, বিশেষ করে যদি সমস্যা বারবার হয় বা কয়েক সপ্তাহেও না কমে।
নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন:
- প্রচুর বা চলমান রক্তপাত।
- মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি বা অতিরিক্ত দুর্বলতা।
- তীব্র ব্যথার সঙ্গে জ্বর, পুঁজ বা বাড়তে থাকা ফোলা।
- কালো, আলকাতরার মতো মল।
- দীর্ঘদিন ধরে ক্ষত না সারা বা বারবার ফাটল হওয়া।
মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়লেই সেটিকে ফাটল বা পাইলস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অন্য কারণও থাকতে পারে।
ডা. ফরিদুল ইসলামের পরামর্শে পায়ুপথের ফাটলের চিকিৎসা
পায়ুপথের ফাটলের সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে বা ঘরোয়া যত্নে আরাম না পেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। রোগের কারণ ও তীব্রতা নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। ডা. ফরিদুল ইসলামের নামের সঙ্গে প্রকাশিত যোগ্যতা, কর্মস্থল ও চিকিৎসাসেবার তথ্য প্রকাশের আগে যাচাই করে নিন।
উপসংহার
পায়ুপথের ফাটল একটি কষ্টদায়ক সমস্যা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক যত্নে ভালো হয়ে যায়। আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, মল নরম রাখা, কুসুম গরম পানিতে বসা এবং মলত্যাগের সময় চাপ না দেওয়া উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। তবে ফাটল দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার রক্তপাত হলে বা তীব্র ব্যথা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমেই নিরাপদে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।